সত্যরেখা ডেস্ক:
দীর্ঘ সময় বসে থাকা, নিয়মিত শরীরচর্চার অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে দিন দিন বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি। উদ্বেগের বিষয় হলো, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেও প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় আক্রান্ত থাকলেও তা বুঝতে পারেন না। সময়মতো সচেতন না হলে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। খবর হিন্দুস্তান টাইমসের।
ফ্যাটি লিভার থেকে কি শেষ পর্যন্ত লিভার ক্যান্সার হতে পারে? এ রোগ কখন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে? হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভারতের দেরাদুনের কৈলাশ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট চিকিৎসক শাশ্বত তিওয়ারি। তাঁর মতে, ফ্যাটি লিভার থাকলেই ক্যান্সার হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে লিভারে প্রদাহ, টিস্যুর ক্ষত কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
যেভাবে ফ্যাটি লিভার বাড়াতে পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি
লিভারের কোষে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চর্বি জমা হলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগের তেমন কোনো উপসর্গ দেখা না দিলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমে থাকা চর্বি থেকে লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে স্টিয়াটোহেপাটাইটিস বলা হয়।
দীর্ঘদিন প্রদাহ চলতে থাকলে লিভারের টিস্যুতে ক্ষত বা দাগ তৈরি হয়, যা ফাইব্রোসিস নামে পরিচিত। ক্ষতির মাত্রা বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে সিরোসিস হতে পারে। আর লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
চিকিৎসক শাশ্বত তিওয়ারির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফ্যাটি লিভার থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করে রোগের অগ্রগতি ও লিভারের ক্ষতির মাত্রার ওপর। তবে ফ্যাটি লিভার হলেই সবার লিভারে গুরুতর ক্ষতি হবে, এমন নয়। কিছু ক্ষেত্রে সিরোসিস ছাড়াও লিভার ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।
লিভারের সমস্যায় যে ৭টি লক্ষণ অবহেলা করা যাবে না
ফ্যাটি লিভার কিংবা লিভার ক্যান্সার—উভয় রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই লক্ষণ অনুপস্থিত থাকতে পারে। তবে রোগের অগ্রগতির সঙ্গে কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যান্সার হয়েছে, এমন নয়। কিন্তু লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অস্বাভাবিক মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
১. কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
খাদ্যাভ্যাস কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাপনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না আনার পরও যদি দ্রুত ওজন কমতে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস লিভারের সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।
২. ক্ষুধা কমে যাওয়া
আগের তুলনায় খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, অল্প খাবার খেয়েই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি কিংবা দীর্ঘদিন ক্ষুধামন্দা থাকলে এর কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। এসব লক্ষণের সঙ্গে ওজন কমতে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. দীর্ঘদিন পেটব্যথা থাকা
পেটের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা কিছুদিন পরপর ফিরে এলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়। লিভারের অসুস্থতা ছাড়াও বিভিন্ন কারণে পেটে ব্যথা হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে রোগ নির্ধারণ না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
৪. পেটের ডান ওপরের দিকে ব্যথা বা অস্বস্তি
লিভার পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে অবস্থিত। এই জায়গায় বারবার ব্যথা, চাপ কিংবা অস্বস্তি অনুভূত হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। তবে এমন অস্বস্তির পেছনে অন্যান্য কারণও থাকতে পারে; এটি একাই লিভার ক্যান্সারের প্রমাণ নয়।
৫. পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া
পেটে তরল জমার কারণে পেটের আকার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। উন্নত পর্যায়ের লিভার রোগে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হঠাৎ পেট ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
৬. চোখ ও ত্বকে হলুদাভ ভাব
চোখের সাদা অংশ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়াকে জন্ডিস বলা হয়। লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া, পিত্তনালির সমস্যা কিংবা অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার কারণে এ লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
৭. বিশ্রামের পরও ক্লান্তি না কমা
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি শরীরে ক্লান্তি থাকে, শক্তি কম মনে হয় কিংবা দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। ক্লান্তির পেছনে রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা অন্যান্য রোগও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চললে চিকিৎসকের পরামর্শে কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হলে করণীয়
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমেই রোগের অবস্থা ও ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভারের কার্যকারিতা, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম কিংবা লিভারে ফাইব্রোসিসের মাত্রা নির্ণয়ের বিশেষ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ধরন নির্ভর করবে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর।
ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপনে আনুন পরিবর্তন
ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে এবং রোগের অগ্রগতি ঠেকাতে দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।
নিয়মিত শরীরচর্চা: প্রতিদিন হাঁটা এবং অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।
স্বাস্থ্যকর খাবার: অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয় ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার কমিয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করুন।
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। এসব সমস্যার সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
নিজে থেকে ওষুধ নয়: লিভার ভালো করার দাবি করা ওষুধ কিংবা ভেষজ উপাদান চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করবেন না।
সব মিলিয়ে, ফ্যাটি লিভার সাধারণ একটি স্বাস্থ্যসমস্যা হলেও একে অবহেলা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে এ রোগ শনাক্ত হলেই লিভার ক্যান্সার হবে—এমন আশঙ্কা করাও অযৌক্তিক। বরং লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি প্রদাহ বা টিস্যুর ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা সময়মতো শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।