পুলিশ প্রশাসন ও সাংবাদিকদের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি কোনো নতুন বিষয় নয়। যদিও বাস্তবতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতার নীতি, প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব থেকেই এই দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি।
একজন সাংবাদিক পুলিশের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন, তখন সেটি প্রকাশের আগে সংবাদটির পরিপূর্ণতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগই সাংবাদিকতার স্বীকৃত ও নৈতিক নিয়ম। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সাব-ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তিনি যেহেতু ওসি, সার্কেল ও পুলিশ সুপারের অধীনস্থ সেহেতু সাংবাদিক সেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই বক্তব্য গ্রহণ করেন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক সময় ওসি, সার্কেল বা পুলিশ সুপার এই বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ছাপিয়ে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন আরম্ভ করেন। ফলে সাংবাদিকের প্রতি তাদের মনোভাব হয় নেতিবাচক। অথচ সাংবাদিকের অবস্থান স্পষ্ট।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা, তদন্তের মাধ্যমে দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্পূর্ণভাবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ ও আইনানুগ প্রক্রিয়ার অংশ।
পুলিশ আইনি বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণই প্রত্যাশিত। এখানে সাংবাদিকের কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য অনেক সময়েই অনুপস্থিত। সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে অনিয়মের তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরেন এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চান।
অনেক ক্ষেত্রেই, সাংবাদিকের প্রশ্নের সঠিক ও স্পষ্ট উত্তর দিতে না পেরে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ভিন্ন নজরে দেখতে শুরু করেন। পুলিশের আচরণ যেন বলতে চায়“কালই তো সাংবাদিক অফিসে এসে চা খেয়ে গেল, আজ কেন এই প্রশ্ন?” কিন্তু সাংবাদিকতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো যোগসূত্র অনেকক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সৌজন্য বা পরিচয় কখনোই বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না।
সাংবাদিকরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে জানাতে চান, সংবাদের ভারসাম্য ও পরিপূর্ণতার জন্য আপনাদের বক্তব্য নেওয়া হয়, এটিকে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনার অধীনস্থ কেউ অন্যায় করলে তাকে ‘সহকর্মী’ বা ‘নিজের লোক’ হিসেবে নয় বরং একজন অভিযুক্ত হিসেবেই দেখা উচিত।
জাতীয় দৈনিক সরেজমিন বার্তার সিনিয়র রিপোর্টার, সাংবাদিক আলাউদ্দিনের ভাষ্য, “পুলিশ ও সাংবাদিক উভয়ই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের কাজের লক্ষ্য এক নয়, কিন্তু উদ্দেশ্য অভিন্ন। আর তা হল জনস্বার্থ রক্ষা। একজন সাংবাদিক যখন পুলিশের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করেন তখন সেটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয় বরং পেশাগত দায়িত্ব থেকেই করা হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় দেখা যায় সাংবাদিকতার নীতি ও প্রক্রিয়া না বুঝে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে নেন। ‘কালকে চা খেলাম, আজ প্রশ্ন কেন’—এই মানসিকতা পেশাগত সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। সংবাদে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। এখানে সত্য ও জবাবদিহিতাই মুখ্য।
প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের পর যদি কোনো দৃশ্যমান প্রতিকার বা অগ্রগতি না দেখা যায়, তখন সাংবাদিকের দায়িত্ব আরও বড়। সে ক্ষেত্রে সাংবাদিক ওসি, সার্কেল বা পুলিশ সুপারের কাছে জানতে চান, ঘটনাটি কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে? তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না? তদন্তের অগ্রগতি কী? দোষ প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই সাংবাদিকতার মূল কাজ। কারণ সংবাদ হলো মানুষ যা জানতে চায়, সেটাই জানানো। সত্য উদঘাটন করা এবং ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব।
এভাবেই দ্বিতীয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যেখানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ তুলে ধরা হয়। কিন্তু এখানেই শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকের সম্পর্কের অবনতি।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিক সমাজের স্পষ্ট বক্তব্য পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশ এখনও সাংবাদিকতার নীতি, শৃঙ্খলা ও পেশাগত সীমারেখা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এটি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার একটি দায়িত্বশীল পেশা।
সিনিয়র রিপোর্টার আলাউদ্দিনের ভাষ্য, “আমি মনে করি, সাংবাদিকতাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে সহযোগী শক্তি হিসেবে দেখলে পুলিশ ও গণমাধ্যমের মধ্যকার দূরত্ব অনেকটাই কমে যাবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পেশাগত বোঝাপড়াই পারে এই টানাপোড়েনের অবসান ঘটাতে।”
সাংবাদিক, ফেস দ্যা পিপল